একজন নাজমুলের গল্প।

সদর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরবো বলে ইজিবাইকের জন্য দাড়িয়ে আছি।দূর থেকে একজন অল্পবয়সী ছেলে হাক ডাক দিয়ে বলল ‘ভাই যাবেন নাকি?’ আমি হ্যাঁ বলে সোজা তার গাড়ীতে উঠে বসলাম।তারপর গাড়ি ছেড়ে দিলো আপন গতিতে।মন চাইলো একটু গল্প করি ছেলেটার সাথে, যেই ভাবনা সেই মুহূর্ত কাজ আর কি! আমি বললাম ভাই আপনার নিজের বাইক?
‘জি হ্যাঁ ভাই নিজের।’ ‘কত কেমন হয় দিনে ইনকাম? ‘বলে তার দিকে তাকালাম।সে এবার আমাকে বলা শুরু করলো ‘ভাই আল্লাহর রহমতে ভালো। ভাই আমি পড়া লেখা করি এম এম কলেজে ম্যানেজমেন্টে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।আমি ছাত্র হিসাবে ভালো ছিলাম, অর্থনৈতিক কারনে দূ্রে কোথাও পরীক্ষা দিতে যায় নি।মেট্রিক পরীক্ষার সময় আমারে আমার স্যারেরা বিনা পয়সাতে পড়াতো।আমি লজ্জায় কোনদিন যেতাম আবার কোনদিন যেতাম না।পাড়ার এক বড় ভাইয়ের কাছে পড়তাম সেও টাকা নিতো না।আমি জোর করে কিছু টাকা দিতাম।কারণ আমার লজ্জা করতো’একটু ভারাক্রান্ত কন্ঠে বললো।তারপর আবার শুরু করলো ‘এইভাবে আইয়ে পাশ করেছি।গ্রামে টিউশনি পড়ালে কেউ টাকা দিতে চায় না।একে তো কম,তারপর আবার খালি ঘুরায়। মাসের পর মাস জুতা খয় হয়ে যায়, কিন্তু কেউ টাকা দেয় না।তাই ইচ্ছা করেই ইজিবাইক কিনে নিয়েছি,ভাই।আল্লাহর রহমতে কোনদিন ১০০০/ আবার কোন দিন ১৫০০/ হয়।আজ ১০০০হয়েছে!’
আমি আর একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম ‘ বাইক কি নিজের? ‘
উত্তরে আবার বলা শুরু করলো ‘হ্যাঁ ভাই নিজের।আমি সেই মেট্রিক পরীক্ষার সময় থেকে নিচের ক্লাসের ছেলেদের টিউশনি করাতাম।সেই টাকা দিয়ে ১০ কাটা বেগুন চাষ করে ছিলাম।সেবার আমার লাভ হয়ে ৫০হাজার টাকা বালিশের নিচে জমা ছিলো।আর কিছু টাকা দিয়ে বাইক কিনেছি।আল্লাহর রহমতে এখন ভালো চলছে।বাবারে নিজের ২লাখ টাকা দিয়ে মুদি দোকান করে দিয়েছি।আমি আর ছোট ভাই পড়া লেখা করি।আর ব্যাংকে আড়াই লাখ মত নগদ টাকা জমা আছে।’
এত সহজ সোজা কথা শুনে আমি আরো অবাক হয়।মনে হলো আমি তার কত বছরের চেনা জানা লোক! আমি আরো বলি ‘টাকা দিয়ে তো ব্যবসা করতে পারতেন? বাইক না চালিয়ে।’ সে এবার আরো অবাক করার কথা শুনালো গাড়ীর গতিবেগ একটু থামিয়ে।মেট্রিকের পর তার নাকি পুলিশের চাকুরী হওয়ার কথা ছিলো! কিন্তু হয় নি পাঁচ লাখ টাকার কারনে(তার বিশ্বাস ঘুষ ছাড়া দেশে কোন চাকুরী নাই)।কথা বলতে বলতে একজন লোককে নামিয়ে দিলো রেল স্টেশনে।তারপর আবার চলা শুরু।আমার কৌতূহলী আরো বেড়ে গেলো।তো টাকা জমানোর কারন কি? সে উল্টো প্রশ্ন করে বসলো
‘টাকা ছাড়া আজ কারও চাকুরী হয় ভাই?’
আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।তখন সে আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ক্লিয়ার করে বললো ‘আপনি কি ভেবেছেন আমি সারা জীবন বাইক চালাব?’
আমি মাথা টা একটু নাড়ালাম। সে আবার বললো’আমি টাকা জমাচ্ছি আমার চাকুরীর ঘুষের টাকার জন্য!’😭😭😲😲
কথাটা শুনে মনে হচ্ছে আমি যেন কোন ছবির কাহিনী শুনছি।ততক্ষণে সে আমাকে আমার ঠিকানাতে নিয়ে এসেছে।আমি গাড়ী থেকে নেমে দশটাকা পকেট থেকে বের করে তার হাতে দিতেই সে গাড়ীর গতি বাড়িয়ে ছুটে চললো ভাড়া খাটতে অন্য কোথাও ।
এই ভাবে ছুটে চলছে হাজারো নাজমুল।
তাদের(আমি,আপনি সহ যারা একটা সরকারি চাকুরীর আশাতে ঘুরছি) ভাগ্য কি আছে সেটা আল্লাহ ভালো জানে।✌✌✌
দোয়া করি প্রতিটা নাজমুলের জন্য।💜💜💜

Md.Shahin Akter

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s